Header Ads Widget

Responsive Advertisement

দুদক পুনর্গঠন করে বিরোধী দল ও এনসিপিকে টার্গেট করা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব৵ দেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে

ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু শোষণের চিত্রপট কি সত্যিই বদলায়? ১৬ বছর ধরে যারা গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছে, ক্ষমতায় এসে তারা যদি অতীতের স্বৈরাচারের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে—তবে সাধারণ মানুষের আশ্রয় কোথায়?

ঠিক এমন এক জ্বলন্ত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ঘটে যাওয়া একটি প্রতিবাদী মানববন্ধন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর এই আয়োজনে উঠে এসেছে বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর সব অভিযোগ। একজন কলামিস্ট হিসেবে এই ঘটনাটির গভীরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, মানবাধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতার আকাশে আবারও কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে।

নিম্নে পুরো ঘটনার একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

“নতুন স্বৈরাচার হয়ে উঠছেন তারেক রহমান?”— দুদকের পুতুলখেলা ও এনসিপির ভয়ংকর অভিযোগ!

দুদক কি এখন শুধুই বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার?
দীর্ঘ সাত মাস পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠন করেছে বর্তমান সরকার। কিন্তু এই পুনর্গঠনের পেছনে কি সুশাসন, নাকি রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ? এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত কড়া ভাষায় অভিযোগ করেছেন, নতুন এই দুদকের মূল টার্গেট হলো এনসিপি এবং অন্যান্য বিরোধী দল।

মানববন্ধনে সরকারের বিরুদ্ধে গুম ও মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ–সংবলিত ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়ান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা–কর্মীরা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে

বর্তমান বিএনপি সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন— "যদি সাহস থাকে, তবে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত হওয়া দুর্নীতির অভিযোগগুলোর আগে তদন্ত করা হোক।" তার মতে, শেখ হাসিনা সরকারের মতোই বর্তমান সরকার দুদককে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

‘বিগ ব্রাদার’ সিনড্রোম ও বাক্‌স্বাধীনতার আকাল
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে নাহিদ ইসলামের মন্তব্য ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তারেক রহমানের হাতে আজ দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার কোনোটিই সুরক্ষিত নয়। তিনি যেন এক ‘নতুন স্বৈরাচার’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।

  • প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামান্য ‘মিম’ বা ব্যঙ্গ করলেই নেমে আসছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের খাঁড়া।

  • এনসিপির সাবেক নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর এবং গাজীপুরের সিফাতের (সরকারসংশ্লিষ্টদের কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার) বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে।

  • নাহিদ ইসলাম সরাসরি প্রশ্ন রাখেন, “তারেক রহমান কি তবে বাংলাদেশের নতুন বিগ ব্রাদার?”
    তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যদি তারেক রহমান শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারের পথে হাঁটেন, তবে দেশের মানুষ রাজপথেই এর কঠোর জবাব দেবে।

গুমের তদন্তের নামে প্রহসন ও নিখোঁজ জেলের কান্না
নতুন তৈরি হওয়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, এসআরবি এবং সামনে আসতে যাওয়া ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে এনসিপি।

সরকারের মন্ত্রীরা যখন দাবি করছেন গত ৭ মাসে একটি গুমের ঘটনাও ঘটেনি, তখন বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। বাগেরহাটের জেলে মিরাজ শেখ গত ৫ মাস ধরে নিখোঁজ। তার পরিবার থানায় গেলে মামলা নেওয়া হয়নি। পরে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হলেও সেখানে কোস্টগার্ডের নাম উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন নাহিদ।

যে বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, সেই বাহিনীই যদি তদন্তের দায়িত্বে থাকে, তবে কি কখনও ন্যায়বিচার সম্ভব? উল্টো অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর শাস্তির বিধান রাখায় মানুষ এখন মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছে।

আইনের ফাঁকফোকর ও রক্তক্ষরা রাজপথ
পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন না করে উল্টো পুলিশকে বিরোধী দল দমনে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয় মানববন্ধনে। নির্বাচন কমিশনকেও ‘ভুলুণ্ঠিত’ করা হচ্ছে। এমনকি হবিগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপি নেতা–কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ছাত্রশক্তির কর্মী আলিফ তার একটি চোখ হারিয়েছেন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম দৃষ্টান্ত।

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, নতুন মানবাধিকার কমিশন আইনে সরকারি দলকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তিনি অবিলম্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অধ্যাদেশ ফিরিয়ে এনে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানান। একইসঙ্গে র‍্যাবের মতো কোনো বাহিনী যেন নতুন করে গড়ে না ওঠে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জোর দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে পুরোনো কাঠামোকেই নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।” তিনি ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। মানববন্ধনে এনসিপির পাশাপাশি যুবশক্তি এবং ছাত্রশক্তির বিপুল সংখ্যক নেতা–কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

জাতিসংঘের মঞ্চে কী জবাব দেবে সরকার?
আগামী সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত ১৬ বছর ধরে বিএনপির নেতারাই জাতিসংঘে গিয়ে দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার চেয়েছেন। আজ যখন দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, তখন বিশ্ববাসীর সামনে তারা কী জবাব দেবেন— সেই প্রশ্নই ছুড়ে দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।


বিশেষ শিক্ষণীয়: ক্ষমতার আয়নায় সহনশীলতা

ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। যারা গতকাল অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছে, আজ ক্ষমতায় বসে তারা যদি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা জাতির জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতাই হলো একটি পরিপক্ব গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত। ডিজিটাল যুগে মানুষের কণ্ঠরোধ করে কিংবা ভিন্নমতকে 'সন্ত্রাস' আখ্যা দিয়ে সাময়িক পার পাওয়া গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। একটি টেকসই রাষ্ট্র গড়তে হলে শাসকগোষ্ঠীকে অবশ্যই বাক্‌স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। 





Post a Comment

0 Comments