Header Ads Widget

একটি আইফোনের লোভে ঝরে গেল মায়ের একমাত্র মানিক! অপ্রতিম হত্যা

কুমিল্লায় মায়ের আইফোন নিয়ে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়া ১৩ বছরের শিশু অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনদের কান্না।


একটি আইফোনের লোভে ঝরে গেল মায়ের একমাত্র মানিক! অপ্রতিম হত্যার ২২ ঘণ্টার লোমহর্ষক বর্ণনা

সন্তান যখন হাসিমুখে ঘর থেকে বের হয়, কোন মা কি ভাবতে পারে যে ওই হাসিটাই শেষ হাসি? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের কোল আজ শূন্য। যে বয়সে দুরন্তপনায় মেতে থাকার কথা, সেই ১৩ বছরের ফুটফুটে কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে একদল নরপিশাচ। আর এই নির্মমতার পেছনে কারণ জানলে শিউরে উঠবে যে কারও গা— মাত্র একটি মোবাইল ফোন!

অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে পাহাড়ি জঙ্গল থেকে তার ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ উদ্ধারের ২২ ঘণ্টার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক বুকফাটা আর্তনাদের গল্প।

হাসিমুখে বেরিয়ে আর ফেরা হলো না
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল আনুমানিক সাড়ে তিনটা। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বাগমারা (গন্ধমতী) এলাকার বাসা থেকে মায়ের একটি আইফোন নিয়ে বেরিয়েছিল অপ্রতিম।

  • উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ: বন্ধুদের সঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করা।

বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ও মা নাহিদা বেগম তখন বাসাতেই ছিলেন। কে জানত, এই বের হওয়াই অপ্রতিমের জীবনের শেষ যাত্রা! বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, কিন্তু ছেলে তো ফেরে না! সন্ধ্যা আনুমানিক সাতটার দিকে উৎকণ্ঠিত বাবা ওই আইফোনে কল করেন। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি, ফোনটি বন্ধ!

অন্ধকার নেমে এলো পরিবারে
মুহূর্তেই যেন পুরো পরিবারের ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। শুরু হয় হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি। আত্মীয়-স্বজন, ছেলের বন্ধু-বান্ধব— কোথাও বাদ রাখা হয়নি। কিন্তু অপ্রতিম যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! নিরুপায় হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ছুটে যান বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার। ডায়েরির পাতায় লিপিবদ্ধ হয় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ৯৮৩)। পুলিশও মাঠে নামে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে কোনো খোঁজ মেলে না।

—পাহাড়ে মিলল রক্তমাখা নিথর দেহ—
রাত পেরিয়ে সকাল হলো। ১৯ সেপ্টেম্বর (শনিবার) দুপুর ১২টা। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের পশ্চিমপাড়ার একটি পাহাড়ি ঢালের জমিতে দুজন পথচারী— আবদুল কাদের জিলানী এবং ১৬ বছর বয়সী কিশোর হাফেজুর রহমান সাইমন এমন একটি দৃশ্য দেখেন, যা তাদের হতবাক করে দেয়। সেখানে পড়ে ছিল একটি নিথর দেহ!

তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার।

বাবার চোখের সামনে ছেলের করুণ পরিণতি!
যে ছেলেকে কালও হাসতে দেখেছেন, আজ তার কপাল ও পুরো মুখমণ্ডল থেঁতলানো, রক্তে মাখামাখি। ঘাতকরা তাকে এমনভাবে আঘাত করেছে যে চেনার উপায় নেই। কিন্তু মায়ের সেই আইফোনটি লাশের পাশে ছিল না। ময়নাতদন্তের জন্য অপ্রতিমের মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠায় পুলিশ।

যেভাবে ঘাতকদের জালে আটকা পড়ে ১৩ বছরের শিশুটি
শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বুকভরা যন্ত্রণা নিয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন অপ্রতিমের বাবা। কিন্তু মামলা হওয়ার আগেই সিসিটিভি ফুটেজ আর প্রযুক্তির সহায়তায় রহস্যের জাল খুলতে শুরু করে পুলিশ।

আজ রোববার দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন সেই নির্মম হত্যার পেছনের কথা।

  • পরিকল্পিত ফাঁদ: আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার লোভেই ঘাতক চক্র অপ্রতিমকে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে ডেকে নিয়ে যায়।

  • বাঁচার আকুতি ও প্রতিরোধ: সেখানে ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। শুরু হয় ধস্তাধস্তি।

  • নির্মম আঘাত: একপর্যায়ে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং তার সঙ্গে থাকা ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী অপর দুই কিশোর বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় বৃষ্টির মতো আঘাত করতে থাকে।

মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ঘাতক সাইফুল ওই আইফোন নিয়ে অন্য দুজনের সঙ্গে পালিয়ে যায় এবং নিজের বাসার বিছানার নিচে সেটি লুকিয়ে রাখে। শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশ সাইফুলকে আটক করে এবং তার দেখানো মতেই আইফোনটি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় সাইফুল ও অপর দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি সিয়াম (১৯) নামের আরেক তরুণকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

জীবনের চেয়ে কি যন্ত্রের দাম বেশি? (আমাদের শিক্ষণীয়)
একটি আইফোনের দাম হয়তো লাখ টাকা হতে পারে, কিন্তু একটি ১৩ বছরের শিশুর জীবনের কোনো মূল্য কি টাকায় নির্ধারণ করা যায়? আজকের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কতটা অবক্ষয় ঢুকে পড়েছে। অভিভাবকদের জন্য এটি একটি কঠোর সতর্কবার্তা। সন্তানদের হাতে দামি গ্যাজেট তুলে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে— আমরা কি তাদের অজান্তেই বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি না? সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে মিশছে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তির মোহ যেন কোনোভাবেই জীবনের চেয়ে বড় না হয়ে ওঠে, অপ্রতিমের এই করুণ বিদায় আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ