সমুদ্রের বুকে বিভীষিকা! টানা ২৮৬ দিনের মিশনে ৮ মার্কিন সেনার আত্মহত্যার চেষ্টা, ট্রাম্প প্রশাসনের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
বিশাল সমুদ্রের বুকে ভাসমান এক অত্যাধুনিক মার্কিন রণতরি। বাইরে থেকে দেখলে পরাশক্তির দম্ভ মনে হলেও, ভেতরের চিত্রটা যেন এক নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার। হ্যাঁ, মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালনরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এ টানা ২৮৬ দিন অবস্থানকালে ৮ জন সেনাসদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন! সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভয়াবহ তথ্য স্বীকার করে নিয়েছে।
চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নৌসচিবের চিঠি
ডেমোক্রেটিক সিনেটর কারস্টেন গিলিব্র্যান্ড রণতরির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার সেই প্রশ্নের জবাবেই দেশটির ভারপ্রাপ্ত নৌসচিব (সেক্রেটারি) হাং কাও একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির হাতে আসা সেই চিঠিতেই বেরিয়ে এসেছে চরম উৎকণ্ঠার এই তথ্য। চিঠিতে হাং কাও স্পষ্ট করেছেন যে, পুরো স্ট্রাইক গ্রুপে মোট আটজন আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও স্বস্তির বিষয় হলো— এই মিশনে কোনো সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়নি।
ভয়াবহ দুটি আত্মহত্যার চেষ্টা
চিঠিতে আলাদাভাবে দুটি রোমহর্ষক ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা জাহাজের ভেতরের মানসিক বিপর্যয়ের প্রমাণ দেয়:
আগস্টের ঘটনা: আগস্টের শুরুতে রণতরির বিমানবহরে কর্মরত এক নাবিক হঠাৎ করেই জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে যান। তবে দ্রুততার সঙ্গে একটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার তাকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পরে চিকিৎসার জন্য তাকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
মার্চের ঘটনা: এর আগে গত মার্চ মাসে আরেকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার সহকর্মীরা সাহসিকতার সঙ্গে তাকে আটকে ফেলেন এবং পরবর্তীতে তাকে মূল ঘাঁটিতে ফেরত পাঠানো হয়।
টানা ২৮৬ দিনের ভাসমান নরক?
জানা যায়, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। পরবর্তীতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ঠিক আগে এর গতিপথ পরিবর্তন করে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কোথাও কোনো নোঙর না করে টানা ২৮৬ দিন এটি সমুদ্রের বুকেই ভাসমান ছিল। দীর্ঘ এই সমুদ্রবাস শেষে চলতি মাসের শুরুতে থাইল্যান্ডে গিয়ে থামে জাহাজটি।
এই দীর্ঘ সময়ে জাহাজের ভেতরের পরিবেশ নিয়ে ভয়াবহ সব অভিযোগ উঠতে শুরু করে। গত আগস্ট মাসে সেনাদের পরিবার ও আইনপ্রণেতারা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ— জাহাজে পর্যাপ্ত খাবারের অভাব রয়েছে, পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন এবং সেনাসদস্যরা ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
অভিযোগ বনাম ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি
রণতরিতে এমন অমানবিক পরিস্থিতির খবর মার্কিন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সে সময় এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। একই সুরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও দাবি করেছেন, জাহাজের ভেতরের পরিবেশ ও নাবিকদের জীবনযাপন নিয়ে গণমাধ্যমে যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, তা মোটেও সঠিক নয়।
জীবনের মূল্য ও মানসিক স্বাস্থ্য: আমাদের শিক্ষণীয়
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার চেয়েও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। টানা কাজের চাপ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিকূল পরিবেশ যেকোনো মানুষের মানসিক অবস্থাকে নিঃশব্দে ধ্বংস করে দিতে পারে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কাজের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। মনে রাখবেন, জীবন একটাই। কোনো সাময়িক হতাশা বা অবসাদই যেন জীবনের চেয়ে বড় না হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি যেমনই হোক, হাল ছাড়বেন না; প্রয়োজনে প্রিয়জনদের সাথে কথা বলুন বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
রিলেটেড পোস্ট ঃ
গণমাধ্যমের জয়ে ট্রাম্পের ধাক্কা: হোয়াইট হাউসে ফিরছে সিএনএন
রক্তের সাগর ইয়েমেন: ১৫ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি, বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ আর এক অন্তহীন ক্ষমতার লড়াই!
0 মন্তব্যসমূহ