
গণতন্ত্রের কান্না নাকি জাগরণ? এক দেশ, একই সরকার—তবুও মুম্বাই ও দিল্লির পুলিশি আচরণে আকাশপাতাল ফারাক!
দেশের দুই প্রান্ত, একই শাসকদলের নিয়ন্ত্রণ, অথচ পুলিশের আচরণে যেন দিন আর রাতের পার্থক্য! প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিতর্কিত ‘এসআইআর’ (ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন) বাতিলের দাবিতে বর্তমানে উত্তাল গোটা দেশ। কিন্তু গত শুক্রবার গান্ধীজয়ন্তীতে মহারাষ্ট্র ও দিল্লির চিত্র যেন গণতন্ত্রের এক অদ্ভুত দ্বিচারিতাকেই সামনে এনেছে। লোহা গরম থাকতেই এবার চূড়ান্ত আঘাত হানতে প্রস্তুত জেন-জি (Gen-Z) এবং ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
মধ্যরাতের আল্টিমেটাম: লক্ষ্য এবার ‘যন্তর মন্তর ২.০’
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে জনতার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখে সিজেপি নেতৃত্ব আর কালক্ষেপণ করেনি। শুক্রবার রাত ঠিক সোয়া ১১টায় ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি যুগান্তকারী ঘোষণা দেন সিজেপি আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে।
তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে আগামী ১০ অক্টোবর রাজধানী কাঁপাতে আসছে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযান। দিপকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, "দিল্লি পুলিশ যেখানে আমাদের পথ আটকাবে, সেই জায়গাই হয়ে উঠবে নতুন যন্তর মন্তর।"
তিনি প্রশাসনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তাঁদের লড়াই মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ মেনে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। সরকার কি এবার নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্মান জানাবে, নাকি গত ২০ জুলাইয়ের মতো পুলিশি বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে—সেই সিদ্ধান্ত প্রশাসনের কোর্টেই ঠেলে দিয়েছেন তিনি।
একই দেশ, দুই রূপ: মুম্বাইয়ের উচ্ছ্বাস বনাম দিল্লির যুদ্ধাবস্থা
বিশ্লেষক হিসেবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে, তা হলো দুই শহরের পুলিশের বৈপরীত্য।
দিল্লির চিত্র: গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর লুটেন্স দিল্লিকে আক্ষরিক অর্থেই দুর্গে পরিণত করা হয়। যন্তর মন্তরগামী প্রতিটি মোড়ে ব্যারিকেড, হাজারো সশস্ত্র পুলিশ, র্যাফ, জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস নিয়ে যেন রীতিমতো যুদ্ধপ্রস্তুতি! সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ আন্দোলনকারী—যাঁরাই সেদিকে পা বাড়িয়েছেন, তাঁদের বাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশের নিজেদের হিসাব মতেই, দিল্লিতে আটক হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ১০০ জন।
মুম্বাইয়ের চিত্র: অন্যদিকে, শিবাজি পার্কে সিজেপি-র ‘জেল ভরো’ আন্দোলন চললেও মুম্বাই পুলিশের ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়ভাবে সংযত। পার্কে ঢোকার অনুমতি না মিললেও, সংলগ্ন রাস্তায় জড়ো হওয়া হাজার হাজার ‘তেলাপোকা’ বা সিজেপি সমর্থককে পুলিশ বিন্দুমাত্র বাধা দেয়নি। কেউ গ্রেপ্তারও হননি। এই পেশাদারিত্বের জন্য মুম্বাই পুলিশকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন দিপকে।
তারকাদের সংহতি ও রাজপথের উত্তাপ
বিকেল ৪টে থেকে শুরু হওয়া মুম্বাইয়ের এই সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পোস্টার হাতে নেমেছিল তারুণ্যের ঢল।
আন্দোলনের নৈতিক জোর বাড়িয়ে দিতে সন্ধ্যা নামতেই মঞ্চে হাজির হন বলিউডের নক্ষত্ররা। প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, বিশাল দাদলানি, বিশাল ভরদ্বাজ এবং হনসল মেহতা-র মতো ব্যক্তিত্বরা এই লড়াইয়ে জেন-জিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন খোদ মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী।
সমাবেশে অভিজিৎ দিপকের একটি মন্তব্য উপস্থিত জনতাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। তিনি বলেন, "গান্ধীজি হলেন ভারতের আত্মা, বাবাসাহেব আম্বেদকর এই দেশের মেরুদণ্ড, আর জওহরলাল নেহরু হলেন ভারতের মন। তাঁদের কোনো বিকল্প নেই, আর এই দেশে গান্ধীজির হত্যাকারীদের কোনো স্থান নেই।"
(উল্লেখ্য, রাতে মুম্বাইয়ের দাদার এলাকায় বজরঙ্গ দলের সাথে তরুণদের সামান্য হাতাহাতি হলেও পুলিশ দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনে।)
রাজনৈতিক সমর্থন ও আইনি লড়াইয়ের ব্লু-প্রিন্ট
সিজেপি-র এই অভাবনীয় উত্থান নজর কেড়েছে বিরোধী শিবিরেরও। ‘ইন্ডিয়া’ জোট এমনিতেই ২ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী আলাদা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। এরই মাঝে শুক্রবার রাতে দিল্লি থেকে কলকাতা ফিরেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিজেপি-র এই আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি তরুণদের ওপর নির্যাতন না করারও কড়া অনুরোধ জানান। তৃণমূল নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাঁদের শর্তহীন সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেছেন, যার জবাবে দিপকেও তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিটি এখন আর শুধু রাজপথের স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই। আইনিভাবে এটি মোকাবিলা করতে ‘ল’য়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর কনস্টিটিউশন’ (এলএএফসি) একটি শক্তিশালী ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন বি লোকুর-এর নেতৃত্বাধীন এই কমিটিতে রয়েছেন সাবেক বিচারপতি এ কে পট্টনায়েক, বদর দুরেজ আহমেদ, রেখা শর্মা এবং অঞ্জনা প্রকাশ। তাঁদের আইনি পরামর্শ দেবেন কপিল সিব্বাল, প্রশান্ত ভূষণ, রেবেকা মেমেন জন, বৃন্দা গ্রোভার-এর মতো দেশের প্রথম সারির আইনজীবীরা।
গণতন্ত্রের আয়নায় আমাদের শিক্ষণীয়
যেকোনো দেশের মূল শক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। যখন জেন-জি বা নতুন প্রজন্ম দেশের কোনো নীতি বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে নামে, তখন সেটি কোনো নির্দিষ্ট দলের আন্দোলন থাকে না, তা পরিণত হয় জাতীয় জাগরণে। এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, দাবি আদায়ের জন্য সহিংসতা নয়, বরং মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে। অন্যদিকে, প্রশাসনেরও উচিত দমন-পীড়নের বদলে সাধারণ মানুষের যৌক্তিক দাবিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা। কারণ, লাঠি বা ব্যারিকেড দিয়ে কখনো মানুষের অধিকারের আওয়াজ চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না।
0 মন্তব্যসমূহ