Header Ads Widget

Responsive Advertisement

রক্তের সাগর ইয়েমেন: ১৫ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি, বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ আর এক অন্তহীন ক্ষমতার লড়াই!



নানা হিসাব-নিকাশ আর ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এখন সবচেয়ে বড় ক্ষতের নাম ইয়েমেন। একদিকে সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনী, অন্যদিকে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি এই দুই পক্ষের লড়াইয়ে ইয়েমেনের মাটি এখন আক্ষরিক অর্থেই বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলমান ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার রেশ ধরে গত জুলাই থেকে সৌদি-হুতি সংঘাত এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে।

পরিসংখ্যান, বাস্তুচ্যুতি এবং সামরিক অস্ত্র ব্যবসার যে উপাত্ত সামনে আসছে, তা বলে দিচ্ছে—পরিস্থিতি খুব দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাচ্ছে সাধারণ মানুষ। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সর্বশেষ ডেটা অনুযায়ী, এই নতুন দফার সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত:

  •  ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

  •  প্রায় ৩ হাজার নিরুপায় ইয়েমেনি প্রাণের দায়ে এডেন উপসাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন।

যুদ্ধের ময়দানের হালনাগাদ চিত্র (বৃহস্পতি ও শুক্রবার)
লড়াইয়ের তীব্রতা কতটা ভয়াবহ, তা গত ৪৮ ঘণ্টার সামরিক পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়।

  •  শুক্রবার (আল-ওয়াজিয়াহ রণাঙ্গন): ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ জেলায় এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন হুতি যোদ্ধা নিহত এবং ৬০ জন আহত হয়েছেন। একই দিনে প্রদেশের আল-ধিকরা, আল-দামনা ও আল-রাহিদা এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়।

  •  বৃহস্পতিবার (এএফপির রিপোর্ট): এর আগের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলায় অন্তত ৪০ জন হুতি এবং পাল্টা হামলায় ইয়েমেনের দুই প্রদেশে ২৩ জন সরকারি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।

লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ও ভূ-রাজনৈতিক ছক
ইয়েমেন এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। সম্প্রতি হুতিরা সরকারি বাহিনীর হাত থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা নিজেদের কব্জায় নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  •  বাব আল–মানদেব প্রণালি (বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ)

  •  মাইয়ুন দ্বীপ ও হানিশ দ্বীপ

  •  বন্দরনগরী মোখা ও তাইজ প্রদেশের কিছু অংশ।

হুতিদের এই অগ্রাসনের ফলে লোহিত সাগর উপকূলের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে, যা সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হুতি নেতা আবদুল মালিক আল–হুতি শুক্রবার স্পষ্ট জানিয়েছেন, সানা বিমানবন্দরে সৌদি হামলার পরই তারা সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হয়েছেন এবং তার দাবি—সৌদির হয়ে এই সামরিক ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

অর্থনীতির রক্তক্ষরণ: ৪ শতাংশ জিডিপি উধাও!
যুদ্ধ শুধু প্রাণ কাড়ছে না, ধ্বংস করছে অর্থনীতিও। জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক অর্থনীতি ও সামাজিক কমিশনের নির্বাহী সচিব রনিয়া আল–মাশাত নিরাপত্তা পরিষদের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ভয়াবহ এক আর্থিক ক্ষতির ডেটা তুলে ধরেছেন। তার মতে, চলমান এই যুদ্ধের কারণে আরব দেশগুলোর অর্থনীতিতে অন্তত ১৫ হাজার কোটি ডলারের বিশাল ক্ষতি হয়েছে, যা এই দেশগুলোর সম্মিলিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশের সমান।

অস্ত্রের মহড়া: ২৫ বিলিয়ন ডলারে ৪৮টি মার্কিন এফ-৩৫
গত বুধবার হুতিরা একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। ঠিক এর পরপরই সামরিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় বড়সড় পদক্ষেপ নেয় রিয়াদ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের কাছে সৌদি আরবের কাছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি (২৫ বিলিয়ন) ডলার মূল্যের ৪৮টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এই যুদ্ধবিমান এর আগে কেবল ন্যাটো ও ইসরায়েলের হাতেই ছিল।

আন্তর্জাতিক মেরুকরণ: পাকিস্তান ও চীনের অবস্থান
এই সংঘাতে মিত্রদের পাশে টানার চেষ্টা করছে সব পক্ষ।

  • পাকিস্তানের সমর্থন: গত মাসে সই হওয়া 'মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি'র (পাকিস্তান, সৌদি ও তুরস্ক) সূত্র ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানিয়েছেন, রিয়াদকে তারা সামরিক ও কূটনৈতিক—সবভাবেই সমর্থন দেবেন।

  • চীনের দ্বিধা: অন্যদিকে, হুতিদের লাগাম টানতে তেহরানকে চাপ দেওয়ার জন্য চীনের দ্বারস্থ হয়েছে সৌদি আরব। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের জন্য এটি বেশ কঠিন। কারণ, ইরান চীনের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। আবার বেইজিং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের নিরাপদ জাহাজ চলাচলও নিশ্চিত করতে চায়।

সব মিলিয়ে, ডেটা এবং গ্রাউন্ড রিয়ালিটি বলছে—ইয়েমেন এখন এমন এক দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে, যেখানে ক্ষমতার লড়াইয়ে বলি হচ্ছে কেবল সাধারণ মানুষ।


যুদ্ধের নির্মম পাঠ: ক্ষমতার মোহ বনাম জীবনের মূল্য
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো যুদ্ধই কখনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে না, বরং রেখে যায় লাশের পাহাড় আর অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপ। ইয়েমেনের এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতার মোহের কাছে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য কতটা তুচ্ছ! ১৫ হাজার কোটি ডলারের যে অর্থ আজ ধ্বংসের পেছনে ব্যয় হচ্ছে, তা যদি মানবতার কল্যাণে ব্যয় হতো, তবে পৃথিবীটা হয়তো অন্যরকম হতে পারত। আমাদের জন্য বড় শিক্ষণীয় বিষয় হলো—অস্ত্রের আস্ফালন নয়, বরং কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই পারে যেকোনো সংকট সমাধান করতে। যুদ্ধ কেবল ধ্বংসই করে, নির্মাণ করতে পারে না।


Post a Comment

0 Comments