পর্দার আড়ালে কি দেশের মাটি ও মানুষের অধিকার নিয়ে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র চলছে? তিস্তা ব্যারেজ ইস্যুতে সরকারের নীরবতা বা লুকোচুরির নেপথ্যে আসলে কাদের ইশারা কাজ করছে? এমন হাজারো প্রশ্ন যখন সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই রাজপথ থেকে ভেসে এলো এক বজ্রকঠিন হুঁশিয়ারি। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভিনদেশি হস্তক্ষেপ আর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না—এমনটাই দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালের ঘটনা। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সাড়ে ৯টা। গাজীপুর মহানগরীর ব্যস্ততম এলাকা ভোগড়া-বাইপাসের টাঙ্গাইল রোডে হঠাৎ করেই আছড়ে পড়ে জনতার ঢল। উপলক্ষ্য—১১ দলের ডাকা এক বিশাল লংমার্চ। আর এই লংমার্চের পথসভাতেই বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রীতিমতো বিস্ফোরক সব মন্তব্য করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে দেন তিনি।
তিস্তা নিয়ে লুকোচুরি: আর ছাড় নয়
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা ইস্যু নিয়ে অনুসন্ধানী মহলে যখন নানা গুঞ্জন, তখন এই পথসভা থেকে সরাসরি সরকারের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেওয়া হয়। মাওলানা মামুনুল হক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো বাংলার সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে যেন ছিনিমিনি খেলতে না পারে।
তার সাফ কথা: "বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য তারা নিজেরাই নিজেদের হাতে গড়বে। তিস্তা ব্যারেজ নিয়ে সরকারের কোনো লুকোচুরি আর বরদাশত করা হবে না।"
গণভোট ও ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে আল্টিমেটাম
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বর্তমান শাসনকাঠামোর প্রতি একটি সুস্পষ্ট আল্টিমেটাম ছুড়ে দেন। রাজপথের উত্তাপকে পুঁজি করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস।
বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি বিশেষ দাবি:
১১ দলের গণদাবি আদায়ের জন্য তারা রাজপথে নেমেছেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, "গণভোটের গণরায়কে কার্যকর করা ছাড়া বর্তমান সরকারের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। তারেক জিয়া সরকারকে গণভোটের রায় কার্যকর করেই ক্ষমতা ছাড়তে হবে ইনশাল্লাহ।"
গুম-খুন ও রক্তের দায় মেটানোর ডাক
অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সব সময়ই একটি স্পর্শকাতর জায়গা। সেই ক্ষতে যেন আরও একবার প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন এই নেতা। তিনি শহীদ শরীফ ওসমান হাদী এবং ইলিয়াস আলীসহ গুম ও হত্যার শিকার হওয়া সকল মজলুমের কথা গভীর আবেগের সাথে স্মরণ করেন।
হত্যাকারীদের হস্তান্তর প্রসঙ্গ: শহীদ ওসমান হাদীর হত্যাকারীদের এখনো বাংলাদেশের বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তর না করায় তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, একটি বিশেষ মহল বাংলার মানুষের সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলার চেষ্টা করছে।
লংমার্চের এই উত্তাল মঞ্চ থেকে ভিনদেশীয় অপশক্তিগুলোর প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, "আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই—আন্দোলন ও সংগ্রামে আমরা সফল হবই ইনশাআল্লাহ। গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচার বাংলার মানুষ কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বে।"
সচেতন নাগরিকের পাঠ: আমাদের শিক্ষণীয়
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে নদীর জলের অধিকার বা ভূ-রাজনৈতিক চুক্তির মতো বিষয়গুলো সরাসরি প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সাথে জড়িত। গুম-খুন বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য কখনো সুফল বয়ে আনে না। নাগরিক হিসেবে আমাদের অন্ধ আবেগে গা না ভাসিয়ে, দেশের প্রকৃত স্বার্থ কোথায় তা নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি বা প্রতিবাদের ভাষা যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষকে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে যেন দেশি বা বিদেশি কোনো অপশক্তি আমাদের জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরাতে না পারে। অধিকার আদায়ের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের দাবি সোচ্চার করাটাই আধুনিক ও সচেতন সমাজের কাজ।
0 মন্তব্যসমূহ